1. aponi955@gmail.com : Apon Islam : Apon Islam
  2. mdarifpress@gmail.com : Nure Alam Siddky Arif : Nure Alam Siddky Arif
  3. hasanchy52@gmail.com : hasanchy :
  4. sandhanitv@gmail.com : Kamrul Hasan : Kamrul Hasan
  5. glorius01716@gmail.com : Md Mizanur Rahman : Md Mizanur Rahman
  6. mrshasanchy@gmail.com : Riha Chy : Riha Chy
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০১:২৪ অপরাহ্ন

বিনামূল্যের ঘর পেতে লাখ টাকা ঘুষ

  • প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২০
  • ৬০ বার দেখা হয়েছে

প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিনামূল্যের ঘর পেতে লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে চেয়ারম্যান এবং মেম্বারদের। গাইবান্ধার প্রায় উপজেলার এমন চিত্র। ঘরের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে জোরালো। উপকারভোগীদের অনেকেই বলেছেন ঘুষের টাকা দিয়ে এর চেয়ে ভালো ঘর নিজেরাই তৈরি করতে পারতেন। গরিবদের জন্য ঘরগুলোর বরাদ্দ দেয়ার কথা থাকলেও টাকা পয়সা আছে এমন ব্যক্তিদের দেয়া হয়েছে বেশির ভাগ ঘর। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে উঠে এসেছে এসব চিত্র। ঘর নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাই এই দুর্নীতির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। বিশেষ   পৃষ্ঠা ১০ কলাম ১
করে কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ জোরালো।

হতদরিদ্রদের কষ্ট লাঘবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এ ঘরগুলো বিনামূল্যে বিতরণের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ঘরপ্রতি ৭০ হাজার থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকন, মেম্বার আব্দুল ওয়াহেদ সাজু ও শামসুজ্জোহা, কচুয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান, ঘুড়িদহ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ ও মহিলা মেম্বার আঙ্গুরী বেগমের বিরুদ্ধে। একই অবস্থা উপজেলার বাকি ৭টি ইউনিয়নেও। হতদরিদ্রদের এসব ঘর নিয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেছেন চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে গাইবান্ধার সাত উপজেলার ৮২টি ইউনিয়নে ৪২০টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে।
সরজমিন সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, সরকারের দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণের কাজ বেশ জোরেশোরেই চলছে। কোনো কোনো ঘরে ইটের গাঁথুনি চলছে। কোথাও আবার চলছে রংয়ের কাজ। কোনোটি রং করার অপেক্ষায়। কোনোটির নির্মাণ কাজ শেষ।
ঘর পাওয়া সাঘাটা উপজেলার ধনারুহা গ্রামের স্বপ্না বেগম জানান, নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে তার স্বামী বিভিন্ন গ্রামে কাজ করেন। তার এক মেয়ে ঢাকায় গার্মেন্টস শ্রমিক। অভাবের সংসারে পাকা ঘরে থাকার ইচ্ছা থাকলেও উপায় ছিল না। এমন সময় মুক্তিনগর ইউপি সদস্য ও প্রতিবেশী আব্দুল ওয়াহেদ সাজু পাকা ঘরের স্বপ্ন দেখালেন। কম খরচেই মিলবে ঘর। দুটি পাকা রুম, একটি রান্না-ঘর ও বাথরুমসহ সরকারের ডিজাইনের চেয়েও বেশি কিছু। এমন স্বপ্ন দেখানোর পরে দেড় লাখ টাকা ঘুষ চান। ধার দেনা করে ও নিজের জমানো টাকা, গার্মেন্টস কর্মী মেয়ের জমানো টাকা একত্রে করে মেম্বারের হাতে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা তুলে দেন তিনি। এরপর বছর যেতে না যেতেই পেয়ে যান সরকারি ঘর। ঘর বুঝে পাওয়ার পর তার চেতনা ফেরে। ওই টাকা ঘুষ হিসেবে না দিয়ে নিজেরাই এর চেয়ে ভালো ঘর তৈরি করতে পারতেন। স্বপ্ন ভঙ্গ হয় তার।
এ ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিন আব্দুল হান্নান বেপারির স্ত্রী সোহাগিনী বেগম বলেন, আমরা ঘর নিয়ে কি যে ভুল করেছি নিজেও জানি না। একটি ঘর নিতে ইউপি চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকনকে ৭০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
এ তালিকায় ধানঘড়া গ্রামের শুকুর উদ্দিনের নাম থাকলেও সরজমিন ঘরের মালিক দুদু মিয়া। দুদু মিয়ার স্ত্রী মঞ্জিলা বেগম জানান, গরু বিক্রি করে নগদ ৮০ হাজার টাকা দেই মুক্তিনগর ইউনিয়নের  চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকনের হাতে। সরকার নাকি বিনামূল্যে ঘর দেয়, আমরা তো টাকার বিনিময়ে পেলাম।
মুক্তিনগর ইউনিয়নের ভরতখালি গ্রামে মৃত বাদশা মিয়ার ছেলে কফিল উদ্দিনের নাম থাকলেও ঘরের মালিক তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম। ঘর নিতে কত টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম জানান, এক লাখ ৮ হাজার টাকা মুক্তিনগর ইউনিয়নের মেম্বার শামসুজ্জোহার হাতে দিয়ে ঘর পেয়েছি।
অপরদিকে, সাঘাটার কচুয়া ইউনিয়নের নতুন ঘরের তালিকা শুরু হতে না হতেই টাকা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে।
কচুয়া ইউনিয়নের উল্যাসোনাতলা গ্রামের ভ্যানচালক শাহজাহান আলী বলেন, আমি একটি ঘরের জন্য চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের কাছে ৯০ হাজার টাকা দিয়েছি। ঘরের কাজ শুরু হলে বাকি টাকা দিতে হবে।
ভ্যানচালক শাহজাহান আলীর স্ত্রী মেলেনা বেগম জানান, আমার প্রতিবন্ধী মেয়ের জন্য একটি ঘর চেয়েছি। একটি ঘরের জন্য মোট এক লাখ ২০ হাজার টাকা চেয়ারম্যানকে দিতে হবে। এর মধ্যে ধারদেনা এবং এনজিও থেকে লোন নিয়ে নগদ ৯০ হাজার টাকা দিয়েছি। তা না হলে সরকারি ঘর দেয় না। কি করবো বাবা, কিছুই তো করার নেই।
কচুয়া ইউনিয়নের উল্যাসোনাতলা গ্রামের ভ্যানচালক চান মিয়া জানান, মনে বড় আশা ছিল ইটের  তৈরি পাকা ঘরে থাকবো। সরকারি পাকা ঘরের খোঁজ নিতে কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে চেয়ারম্যান এক লাখ টাকার দাবি করেন। পরে নগদ এক লাখ টাকার বিনিময়ে ঘর পেয়েছি।
সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউপিরও একই চিত্র। সরকারি ঘর পাওয়া উপকারভোগী ঘুড়িদহ ইউনিয়নের ছমিতন বেগম জানান, সরকারি একটি ঘরের জন্য ঘুড়িদহ ইউপি মহিলা মেম্বার আঙ্গুরী বেগম ও তার স্বামী মোফাজ্জল হোসেনের হাতে ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, তার ঘরের সবগুলো ইট দুই নম্বর। ইটের ব্যাপারে একাধিকবার মহিলা মেম্বারের কাছে অভিযোগ করেও কাজ হয়নি। খারাপ ইট দিয়েই তার ঘরটি তৈরি করা হয়েছে।
ঘুড়িদহ ইউনিয়নের ঝাড়াবর্ষা গ্রামের মোসাম্মৎ বেগমের ছেলে জাহিদুল ইসলাম জানান, একটি ঘরের জন্য ইউপি মেম্বারের সহযোগী মোহাম্মদ ভন্ডুলের হাতে ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। ঘর নির্মাণ কাজ শেষ। এখন টিনের চালা লাগানো বাকি। কাজ শেষে আরো টাকা দিতে হবে।
এ ইউনিয়নের ঝাড়াবর্ষা গ্রামের খোদেজা বেগমের ছেলের বৌ দুলালী বেগম জানান, একটি ঘরের জন্য ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কামাল আজাদের কাছে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছি। ঘরের নির্মাণকাজ শেষ। এখন বারান্দার কাজ বাকি আছে।
শান্ত মিয়া নামের এক নির্মাণ শ্রমিক জানান, সরকারি ডিজাইন অনুযায়ী আমরা যখন ঘরের নির্মাণ কাজ করি তখন উপকারভোগীরা বাধা দেয়। সরকারের বিনামূল্যের ঘরের জন্য ঘুষের টাকা লেনদেনের কারণে প্রতিদিন লাঞ্ছিত হতে হয় নির্মাণ শ্রমিকদের। ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করতে বাধার সম্মুখীন হয়ে বিঘ্ন হচ্ছে নির্মাণকাজ।
বিনামূল্যের ঘর বিতরণে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউপি চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকন, মেম্বার আব্দুল ওয়াহেদ সাজু ও শামসুজ্জোহা, কচুয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান, ঘুড়িদহ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, মহিলা মেম্বার আঙ্গুরী বেগমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে তারা সবাই এই কথা অস্বীকার করেন।
ঘুষ নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকন অস্বীকার করে বলেন, ঘর বিতরণ মেম্বাররা করে। তারা যে কীভাবে কী করেছে খোঁজ নিয়ে জানাবো।
একই ইউনিয়ন পরিষদের অভিযুক্ত মেম্বার আব্দুল ওয়াহেদ সুজা বলেন, আমি টাকা নিয়েছি লাখের উপর। কিন্তু সেটা মাটি কাটার জন্য, ঘরের জন্য নয়। অপর মেম্বার শামসুজ্জোহা সরকার ঘুষ গ্রহণের কথা অস্বীকার করে বলেন, সব মিথ্যা কথা।
কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাকে ফাঁসাতে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। সরকারি ঘরের জন্য কোনো টাকা গ্রহণ করিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও গৃহ নির্মাণ প্রকল্প সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, এসব ঘর বিতরণে কোনো ঘুষের কারবার হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে একই ইউনিয়নের মহিলা মেম্বার আঙ্গুরী বেগম ফোন রিসিভ না করলেও তার স্বামী মোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘরটি আমার শালাকে দিয়েছি। কোনো টাকা নেইনি।
এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিঠুন কুণ্ডু বলেন, টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পের ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৪৬টি ঘর নির্মাণ শেষ ও চলতি ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৭২টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। ঘরগুলো সঠিক ভাবে বুঝে নেয়ার পর বিল পরিশোধ করা হয়।
এ ব্যাপারে সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চেয়ারম্যান/মেম্বাররা উপকারভোগীর তালিকা দেয়। ঘর দেয়ার কথা বলে ঘুষ গ্রহণের প্রমাণ এবং ঘরের মান নিয়ে কোনো অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী বলেন, ঘর বিতরণে ঘুষ গ্রহণের কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেনি। যদি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গাইবান্ধার ৭ উপজেলায় টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পের ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৪২০টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬০ টাকা।

শেয়ার করুন

এই বিভাগের অন্যান্য খবর
© All rights reserved © Sandhani TV
Theme Design by Hasan Chowdhury